গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামগুলোতে আমরা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীতল লড়াই (Cold War) দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান মহলে যা ঘটছে, তা কেবল কোনো থ্রিলার উপন্যাসের পটভূমি হতে পারে না। এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা, যা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাষ্ট্রপ্রধানকেও তদন্তের নির্দেশ দিতে বাধ্য করেছে। ঢাকা থেকে যখন আমরা এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করি, তখন এর শেকড় কেবল ওয়াশিংটনে নয়, বরং মহাকাশ গবেষণা এবং মানবসভ্যতার আগামীর প্রযুক্তির দ্বন্দ্বে প্রোথিত বলে প্রতীয়মান হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু গবেষণা এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে যুক্ত অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীর অস্বাভাবিক মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার খবর এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এদের প্রত্যেকেই এমন সব প্রজেক্টে কাজ করছিলেন, যা সফল হলে পৃথিবীর বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থা এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসত। এই বিজ্ঞানীদের তালিকায় রয়েছেন পারমাণবিক ফিউশন বিশেষজ্ঞ, অ্যান্টিগ্র্যাভিটি গবেষক এবং নাসার ডেটা অ্যানালিস্ট।
নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণার অন্যতম প্রাণপুরুষ স্টিভেন গার্সিয়া। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি এক ভোরে তিনি নিজের বাড়ি থেকে কেবল একটি হ্যান্ডগান নিয়ে উধাও হন। কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা আর্থিক সংকটের খবর ছিল না। একজন বিজ্ঞানীর হাতে যখন টেস্টটিউব বা ল্যাপটপের বদলে আত্মরক্ষার অস্ত্র থাকে, তখনই বোঝা যায় তিনি কতটা ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি কি কোনো বিশেষ 'থ্রেট' পেয়েছিলেন?
সবচেয়ে আলোচিত এবং বেদনাদায়ক মৃত্যুটি হলো ৩৪ বছর বয়সী অ্যান্টিগ্র্যাভিটি বিজ্ঞানী অ্যামি এস্করিজের। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং তার ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তার জীবন সংকটে। অ্যামি কাজ করছিলেন 'প্রপালশন সিস্টেম' নিয়ে, যা জ্বালানি ছাড়াই মহাকাশযান চালানোর সক্ষমতা রাখে। তার নিথর দেহ হ্রদে ভেসে ওঠা কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং বিজ্ঞানের এক বৈপ্লবিক সম্ভাবনার মৃত্যু।
সম্প্রতি এক প্রেস কনফারেন্সে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত গম্ভীর মুখে জানান, "এটি কেবল কিছু বিজ্ঞানীর মৃত্যু নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। আমি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি।"
বাংলাদেশি বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের দুটি দিক থাকতে পারে:
প্রথমত: তিনি হয়তো বোঝাতে চাইছেন যে পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় (বাইডেন প্রশাসন) দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: তিনি এমন কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য জানেন যা তিনি জনসমক্ষে আনতে চাইছেন, বিশেষ করে 'ইউএফও কভারআপ' সংক্রান্ত বিষয়গুলো।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে রয়েছে 'Reverse Engineering of Alien Technology' বা ভিনগ্রহের প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন কিছু উদ্ভাবন।
গত কয়েক বছরে পেন্টাগন এবং মার্কিন নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ কিছু ইউএপি (Unidentified Aerial Phenomena) বা ইউএফও-র ভিডিও প্রকাশ করেছে। অবসরপ্রাপ্ত ইন্টেলিজেন্স অফিসার ডেভিড গ্রাশের মতো ব্যক্তিরা মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভিনগ্রহের যান এবং তার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, মৃত বিজ্ঞানীরা হয়তো এই ভিনগ্রহের যানগুলোর 'প্রপালশন সিস্টেম' বা মাধ্যাকর্ষণহীন ওড়ার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিলেন। যদি অ্যান্টিগ্র্যাভিটি প্রযুক্তি মানুষের হাতের নাগালে চলে আসে, তবে ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ তেল বা বিদ্যুৎ শিল্প মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। এখানেই কি তবে বড় বড় কর্পোরেট বা 'ডিপ স্টেট'-এর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল?
ওহাইও-র রাইটপ্যাটারসন এয়ারফোর্স বেসটি ঐতিহাসিকভাবেই ইউএফও এবং মহাকাশ গবেষণার জন্য কুখ্যাত। এই বেসের প্রাক্তন কমান্ডার মেজর জেনারেল উইলিয়াম ম্যাককাসল্যান্ড নিখোঁজ হওয়াটা বড় ধরনের শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। তিনি কোনো সাধারণ অফিসার নন; তিনি ছিলেন ইউএফও সম্পর্কিত অত্যন্ত গোপন নথির নিয়ন্ত্রক। একজন জেনারেলের নিখোঁজ হওয়া এবং বিজ্ঞানীদের মৃত্যু একই সূত্রে গাঁথা বলে অনেকে মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান কারণ সামনে আসে:
হয়তো এই বিজ্ঞানীরা এমন কোনো সত্য জেনে ফেলেছিলেন যা সাধারণ মানুষের সামনে এলে বিশ্বব্যবস্থা (Global Order) ওলটপালট হয়ে যেত। ধর্ম, বিজ্ঞান এবং অর্থনীতির ভিত্তি বদলে দিতে পারে এমন তথ্য ধামাচাপা দিতেই কি তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
রাশিয়া বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলো কি মার্কিন গবেষণাকে পিছিয়ে দিতে এই ধরনের গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে? তবে মার্কিন ভূখণ্ডে ঢুকে এতগুলো শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীকে নিখোঁজ করে দেওয়া বিদেশি গোয়েন্দাদের জন্য প্রায় অসম্ভব কাজ।
এটি শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, তাত্ত্বিকদের একাংশ মনে করেন, উচ্চতর কোনো সভ্যতা হয়তো চায় না মানুষ এখনই মহাকাশ ভ্রমণের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করুক। তাই অ্যান্টিগ্র্যাভিটি বা ফিউশনের মতো গবেষণায় যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারাই টার্গেট হচ্ছেন।
বিজ্ঞানীদের এই রহস্যময় মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জ্ঞান সবসময় কেবল আশীর্বাদ নয়, মাঝে মাঝে তা জীবননাশের কারণও হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশে যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সুরক্ষা সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হয়, সেখানে একের পর এক বিজ্ঞানীর হারিয়ে যাওয়া সারা বিশ্বের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
বাংলাদেশসহ উদীয়মান দেশগুলোর জন্যও এখানে শিক্ষার বিষয় আছে। বিজ্ঞানের উচ্চতর গবেষণার পাশাপাশি মেধাবীদের সুরক্ষা এবং গবেষণার তথ্যের নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ট্রাম্পের তদন্ত শেষ পর্যন্ত কী বের করে আনে তা সময়ই বলবে। তবে অ্যামি এস্করিজ বা কার্ল গ্রিলমায়ারদের রক্তমাখা বারান্দাগুলো যে প্রশ্ন রেখে গেছে, তার উত্তর মহাকাশের কোনো এক ব্ল্যাকহোলেই হয়তো লুকিয়ে আছে। আপাতত বিশ্ববাসী কেবল অপেক্ষা করতে পারে এক ভয়ংকর সত্যের বিস্ফোরণের জন্য।